রবিবার ১৪ জুন ২০২৬
Online Edition

জনগণ কিন্তু জুলুমের বিরুদ্ধে!

জিবলু রহমান : দেখতে দেখতে সময় কেটে যায়। সময় কারও জন্য থেমে থাকে না। আওয়ামী লীগ নতুন মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার পর প্রায় ৩ বছর হয়ে গেল। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়নি। সরকার তার মতো করে চলছে, চালাচ্ছে। সাধারণ মানুষ অসহায়ের মতো সবকিছু দেখছে। শালীনতা ভদ্রতাবোধ উঠে যাচ্ছে রাজনীতি থেকে। সহনশীলতা নেই বললেই চলে। পরমতসহিষ্ণুতা নেই। বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে। আওয়ামী লীগ মনে করছে, এই ক্ষমতা চিরস্থায়ী। ক্ষমতা আর পরিবর্তন হবে না। আর বিএনপিও কোনো ইস্যু তৈরি করতে পারবে না।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি আলোচিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও দলটি জোটগতভাবে বিজয়ী হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩৪, জাতীয় পার্টি ৩৪ এবং আওয়ামী লীগের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি ৬ এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ৫টি আসনে বিজয়ী হয়ে ১২ জানুয়ারি সরকার গঠন করে। এ নির্বাচনে ১৫৪টি আসনে আওয়ামী লীগ ও জোটের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এটি ছিল বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। এছাড়া যে আসনগুলোতে নির্বাচন হয় সেখানেও খুব অল্পসংখ্যক ভোট পড়ে। যদিও নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, গড়ে ৪০% ভোট পড়ে নির্বাচনে। নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। (সূত্রঃ দৈনিক মানব জমিন ১২ জানুয়ারি ২০১৫)
মিডিয়ার দিকে তাকালে প্রতিদিনের চিত্র ভিন্ন ভিন্ন পাওয়া যাচ্ছে। মহাজোট সরকারের একেক মন্ত্রী অথবা নেতা দেশের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে একেক অবস্থান নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন। সরকারের সামনে ঝুলে আছে অনেক চ্যালেঞ্জ। এমনিতেই সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হয়নি বলে গঠিত সংসদ ও সরকার নিয়ে দেশে ও দেশের বাইরে প্রশ্ন রয়েছে।
এরপর রয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করা, পুনরুজ্জীবিত জঙ্গিবাদ মোকাবেলা করার মতো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জের সঙ্গে যদি নিজের ঘর সামলানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়, তাহলে সেটা বড়ই কঠিন কাজ।
সারা দেশে একের পর এক হত্যাকা- বেড়েই চলেছে। আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতিতে সাহসী হয়ে উঠছে খুনিরা। অতি সহজেই ঘটছে হত্যাকা-। উত্ত্যক্তকরণের শিকার সুরাইয়া আক্তার রিসা, নিতু ম-লসহ অনেকে প্রাণ হারিয়েছে। আবার সিলেটের কলেজছাত্রী খাদিজা আক্তারদের মতো অনেককে ধুঁকে ধুঁকে বাঁচতে হচ্ছে। সরকারি দলের এক জনহিতৈষী সংসদ সদস্য তাঁর লাইসেন্স করা অস্ত্র দিয়ে হাত পাকা করতে গিয়ে গুলী করেন এক কিশোরকে।
বগুড়ার গাবতলীর রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের মেম্বার (সদস্য) ও আওয়ামী লীগ সভাপতি খোরশেদ আলমকে বারোটি ককটেলসহ গ্রেফতার করা হয়েছিল। র‌্যাব-১২ বগুড়া স্পেশাল কোম্পানির সদস্যরা ২৬ এপ্রিল ২০১৫ গভীর রাতে গাবতলী উপজেলার হোসেনপুর গ্রামের বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করেন। কর্মকর্তাদের ধারণা, ককটেলগুলো কোনো নাশকতায় ব্যবহারের জন্য মজুদ করা হয়েছিল। খোরশেদ আলম পুলিশকে বলেছেন, তাকে ফাঁসানোর জন্য কেউ ককটেলগুলো রেখে গেছে। (সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর ২৮ এপ্রিল ২০১৫)
à§« জানুয়ারির নির্বাচনী সংকট কাটিয়ে সরকারের কেউ কেউ দাম্ভিকতার চূড়ায় উঠেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে সত্য তুলে ধরতে চারপাশের লোকজন ব্যর্থ হচ্ছেন। সন্ত্রাস, গুম, হত্যা ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। পর্যবেক্ষক মহল বলছে, সন্ত্রাস, গুম, খুন কঠোর হস্তে দমন করতে হলে সংবিধান, আইন ও বিধিবিধানের ঊর্ধ্বে কাউকে উঠতে দেয়া যাবে না। সিভিল প্রশাসন থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয়করণের বৃত্তের বাইরে এনে জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে ঢেলে সাজাতে হবে। র‌্যাবে সংস্কার ও তার পুনর্গঠন এখন সময়ের দাবি। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। পেশাদারিত্বের শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো এ বাহিনীর কর্তাদের র‌্যাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা আর সম্পৃক্ত রাখা উচিত কি না ভাবার সময় এখন। র‌্যাব ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পেশাদারিত্বের ওপর দাঁড় করানোর জন্য, স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত সংস্কার এখন সময়ের দাবি। (সূত্রঃ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ২৪ মে ২০১৪)
শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ থেকে রনি আর রনি থেকে ইব্রাহিমকে কেন গোপনে ছেড়ে দেয়া হলো সে প্রশ্ন মুড়ি-মুড়কির মতো বাজছে মানুষের মুখে মুখে। রাজনৈতিক অভিজ্ঞ মহলের অভিমত, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে জেলায় জেলায় এখন যে কোন্দল, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, শক্তি প্রদর্শন, লুটপাটের রাজনীতির অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে দলকে তা থেকে বের করে আনা জরুরি। সংসদে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মন খুলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মানুষের প্রত্যাশার জায়গা তৈরি করে আস্থা পুনরুদ্ধার দ্রুত প্রয়োজন। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার পাশাপাশি দেশব্যাপী বৈধ অস্ত্র জমা নিয়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসী ধরার জন্য প্রয়োজনে সেনাবাহিনী নামানোর মতো চিন্তা-ভাবনার সময় এখন দোরগোড়ায়। সংসদের বাইরেও সরকারকে দলীয় আজ্ঞাবহ নয়, স্বাধীনচেতা সিভিল সোসাইটি ও রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে, পেশাজীবীদের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে মতামত জানতে হবে। এ সংকট কারও একার নয়। এ সংকট দেশের। সংকট কাটানোর পথ বের করতে হবে। শুধু ব্যবসায়ীদের সংগঠনের নেতৃত্বই নয়, জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখা শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও আলোচনার দরজা খুলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। 
২০১৫ সালের আগস্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও ফজলে নূর তাপস; তথ্যমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী অবস্থান নিয়েছেন একে অন্যের বিপরীতে; সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধাচরণ করছে ছাত্রলীগ। শেখ সেলিম গালমন্দ করছেন জেনারেল শফিউল্লাহ ও তথ্যমন্ত্রীকে। জিএসপি ইস্যুতে বাণিজ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার অবস্থান ছিল দুই মেরুতে। হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদ দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই একাত্মবোধ করে থাকে। অথচ এই সংগঠনের নেতা রানা দাশগুপ্ত যা বলছেন, তাতে আক্রান্ত হচ্ছেন সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী। কোনো কোনো মন্ত্রী এমন কথাও বলছেন, যা সরকারের পলিসির সঙ্গে যায় না। এই যে সমন্বয়হীনতা, তা যদি আরও প্রকট হয়ে ওঠে, তা কি সামাল দেয়া সহজ হবে? ২৪ আগস্ট ২০১৫ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, এখনই দল ও অঙ্গসংগঠনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। এ লক্ষ্যে দলে টাস্কফোর্স গঠনেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। (সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর ২৫ আগস্ট ২০১৫)
‘সন্ত্রাসীদের কোনো দল নেই’-এ কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহুবার বলেছেন। খালেদা জিয়াও বলেছেন। এরশাদসহ রাজনৈতিক নেতারা বলেছেন। মন থেকে বলে থাকলে সব দলকেই সন্ত্রাসীদের দূরে ঠেলে দেয়া উচিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ দ্রুত না নিলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে।
সরকারি এজেন্সি এবং বেসরকারি নানা চক্র কর্তৃক নিরীহ মানুষের হত্যাকা- এখন বাংলাদেশের প্রতিদিনের ঘটনা। শুধু একটি নয়, একাধিক হত্যাকাণ্ডের রিপোর্ট এখন সকালের দিকে সংবাদপত্রের পাতায় এবং টিভি চ্যানেলে দেখা যায়। এ রকমই এক হত্যাকা- হল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ড। এ ছাত্রীটিকে ২০ মার্চ ২০১৬ হত্যা করা হয় এবং কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার এক ঝোপের মধ্যে তার দেহ ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। (সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর ১২ এপ্রিল ২০১৬)
এ নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের কোনো কূলকিনারা পাওয়া যায়নি! প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পরই সরকারপক্ষ থেকে রুটিন বক্তব্য দেয়া হয় এবং দেখা যায়, তারপর কিছুই হয় না। শুধু তাই নয়, অনেক সময় চিহ্নিত হত্যাকারীরা পুলিশের নাকের ডগায় বেশ নিশ্চিন্তে ঘোরাফেরা করে এবং পুরো ব্যাপারটিই ধামাচাপা পড়ে।
কিশোর ত্বকী হত্যার পরে প্রতিবাদ চলেছিল দীর্ঘদিন, কিন্তু তা না পেরেছে এই অপরাধের দুর্গে বিন্দুমাত্র ফাটল ধরাতে, না পেরেছে প্রত্যক্ষ হত্যাকারীদের কিংবা পরোক্ষ প্রশ্রয়দাতাদের বিচারের আওতায় আনতে। নারায়ণগঞ্জে একজন প্রধান শিক্ষক সেখানকার একজন সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের হাতে চরমভাবে লাঞ্ছিত-অপমাণিত হওয়ার ঘটনার তাৎপর্য ব্যাপক। (সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো ১ জুন ২০১৬)
এটি খুন নয়, খুনের অধিক। আমাদের সমাজের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, আদর্শ সবই খুন হয়েছে এ ঘটনায়। সম্ভবত এ কারণে এ ঘটনার বিরুদ্ধে সমাজ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে। আশা করছি, এ ঢেউ সুনামির মতো একের পর এক আছড়ে পড়ে অন্যায় দম্ভের দেয়াল গুঁড়িয়ে দেবে।
আওয়ামী লীগের ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার অঙ্গীকার ছিল। ইশতেহারে এ সংক্রান্ত অগ্রাধিকারভিত্তিক দফায় বলা হয়েছিল, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমুন্নত এবং নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়ন নিশ্চিত করার মতো মৌলিক প্রশ্নে সব রাজনৈতিক দল, শ্রেণি ও পেশাজীবী সংগঠন এবং সিভিল সমাজসহ দল-মতনির্বিশেষে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’ (পৃষ্ঠা-২৩, অগ্রাধিকার-à§§.à§©)
কিন্তু বিগত বছরগুলোয় সরকারের পক্ষ থেকে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এমনকি বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে বিভিন্ন মহল থেকে বারবার আলোচনা ও সংলাপের কথা বলা হলেও সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে পাল্টা প্রশ্ন তোলা হয়-কিসের সংলাপ? কার সঙ্গে সংলাপ? (সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো ১২ জানুয়ারি ২০১৫)
ইশতেহারে ‘আমাদের এবারের অগ্রাধিকারঃ সুশাসন, গণতন্ত্রায়ণ ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন’ শীর্ষক নয়টি দফা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে গত এক বছরে জাতীয় ঐকমত্য যেমন হয়নি, তেমনি রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের সর্বক্ষেত্রে শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা দেয়া এবং তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা বললেও সরকার অনেকাংশে ব্যর্থ হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, ২০১৩ সালে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে মারা গিয়েছিলেন ৭২ জন, ২০১৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৮। এ ছাড়া গত বছর গুম বা গুপ্তহত্যার শিকার ৮৮ জনের মধ্যে ১২ জন ছাড়া পান।
ইশতেহারে বলা হয়, ‘সংবিধান সুরক্ষা, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত করা হবে। সংসদকে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ প্রকৃতপক্ষে জাতীয় সংসদে সরকারের ‘বন্ধুপ্রতিম’ বিরোধী দল থাকা এবং বিরোধীদলীয় নেতারা মন্ত্রী বা দূতের মতো পদে আসীন হওয়ায় সংসদ প্রাণহীন হয়ে পড়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিরোধী সংসদ সদস্যরা আত্মপরিচয়ের সংকটে ভোগায় এক বছরে সংসদ প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারেনি। বছরজুড়ে কয়েকজন সংসদ সদস্যের অনৈতিক কাজের খবর জাতি জানতে পেরেছে, যাঁরা ভূমি, বন ও জলাশয় দখল করেছেন; সরকারের সঙ্গে ব্যবসা করেছেন; নিয়োগ-বাণিজ্যসহ সংসদ সদস্যের পদকে সুবিধা অর্জনের জন্য ব্যবহার করেছেন।
ন্যায়পাল নিয়োগ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা, নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হলেও এমন উদ্যোগ দেখা যায়নি। সর্বস্তরের মানুষের বিচারপ্রাপ্তি সহজলভ্য করা এবং মামলা জটমুক্ত করার অঙ্গীকার থাকলেও গত এক বছরে এসব বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
ইশতেহারে সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ, আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা কার্যক্রম জোরদার করার কথা বলা আছে। রাজনৈতিক অস্থিরতায় সৃষ্ট সুশাসনের অভাবে কার্যত এসব কার্যক্রম দুর্বল হয়েছে।
ইশতেহার অনুযায়ী (১.৭) শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন-শৃঙ্খলা, অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন কর্মসূচি স্তরবিন্যাসের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের হাতে দেয়া হবে। তবে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউনিয়ন পরিষদে সাতটি মন্ত্রণালয়ের ১৩ জন কর্মচারীকে হস্তান্তরের কথা থাকলেও তা হয়নি। উপজেলা পরিষদের কাছে ১৭টি দফতর হস্তান্তর করা হলেও সেগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না। আর জেলা পরিষদ চলছে নামকাওয়াস্তে মনোনীত প্রশাসক দিয়ে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা আরও বাড়ানোর কথা বলা আছে নির্বাচনী ইশতেহারে। এই সময়ে দুদকের কাছ থেকে দায়মুক্তির সনদ পেয়েছেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন, সংসদ সদস্য আসলামুল হক, এনামুল হকসহ মোট ৪৯৯ জন। অবশ্য দুদক অভিযোগপত্র দিয়েছে ৪৬০টি মামলায়।
এই মেয়াদে দুদকের যাত্রা শুরু হয়েছে মনস্তাত্ত্বিক চাপের মধ্য দিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহে সরকারি দলের নেতা ও সাবেক কয়েকজন মন্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও পরে দেখা গেছে, দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ব্যক্তির পরিচয় প্রাধান্য পাওয়ায় অনেককেই দুদক দায়মুক্তি সনদ দিয়েছে।
ইশতেহারের ২৫ পৃষ্ঠায় à§§.৯ নম্বর অগ্রাধিকারে বলা আছে, ‘পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা হবে।’ তবে কাজকর্ম বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুলিশ দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়নি।
লাশের পর লাশ, অপহরণ আর গুম-এ সবই এখন দেশবাসীর নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারস্থ হয়েও প্রতিকার মিলছে না। নিয়তিই প্রতিকার? কোন উত্তরও নেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তাদের কাছে।
তারা এসব ঘটনার পর শুধুই বলছেন, দেখা যাক কি করা যায়, খোঁজ নিয়ে দেখছি আসল ঘটনা কি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে একের পর এক অপহরণের অভিযোগ আর লাশ পাওয়ার ঘটনাকে বলছেন, অভিযোগ উঠতেই পারে। কারও মুখতো আর চাপা দিয়ে বন্ধ করে রাখা যাবে না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণের অভিযোগ টোটালি মিথ্যা।
অধিকার এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ নবেম্বর পর্যন্ত ৫৯ জন গুম হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদের মধ্যে ১০ জনের লাশ পাওয়া গেছে, ৩৪ জনকে গুম করার পর পরবর্তীতে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং ৭ জনকে পরবর্তীতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এখনও পর্যন্ত বাকি ৮ জনের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ